মৌসুমে দারুণ খেলেই লিগ জিতেছে লিভারপুল।

ক্লপের লিভারপুলকে হুবহু নকল করবে না চেলসি

৩০ বছর পর ইংল্যান্ডের শীর্ষ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে লিভারপুল। তা-ও আবার ৭ ম্যাচ হাতে রেখে। ইয়ুর্গেন ক্লপের দল এই মৌসুমে ভেঙেছে রেকর্ডের পর রেকর্ড। ঘরের মাঠে টানা ২৩ জয়সহ কত মণি– মুক্তাই না যোগ হয়েছে সেই তালিকায়। গত বছরে জিতেছিল ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট চ্যাম্পিয়নস লিগও। 

এমন সাফল্যের পর কোনো দল লিভারপুলের সাফল্যের কারণগুলো অনুকরণ করতে চাইবে, এমনটা হওয়াই তো স্বাভাবিক। কিন্তু লিভারপুলকে নকল করার কোনো ইচ্ছে নেই বলে সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন চেলসির কোচ ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড। বরং নিজেদের দর্শনেই চেলসি সাফল্য অর্জন করবে বলে মনে করেন তিনি।

আগের মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের পর হাতে ধরা দিয়েছে অধরা লিগ শিরোপাও। মাঝে এসেছে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ। ক্লপের দুর্দান্ত লিভারপুলের সাফল্যের রহস্যটা সবারই জানা। তা হলো দুর্দান্ত একটি দল তৈরি করা। গোলপোস্টে আলিসন বেকার, রক্ষণে ভার্জিল ফন ডাইক, আক্রমণে সাদিও মানে-মোহামেদ সালাহদের মতো তারকা ফুটবলারদের দলে এনে এক সুতোয় বেঁধেছেন ক্লপ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তাঁর ‘মাস্টার মাইন্ড।’
কিন্তু সেটা তো আর রাতারাতি হয়নি। রবার্তো ফিরমিনোর পাশে সালাহ-মানেদের এনে প্রথমে দলের আক্রমণে গতি আর গোল বাড়িয়েছেন ক্লপ। লিভারপুল তখন ছিল দারুণ গতিময় চোখধাঁধানো ফুটবল খেলা এক দল। কিন্তু উল্টোদিকে রক্ষণটা তখন ছিল নড়বড়ে। সে খামতি ঢাকতে রক্ষণে প্রথমে ফন ডাইক আর পরে আলিসনকে এনে দারুণ দলটাকে শিরোপাজয়ীও বানিয়েছেন ক্লপ।
ল্যাম্পার্ডকেও দেখা যাচ্ছে অনেকটা একই পথে হাঁটতে। এরই মধ্যে টাকার থলে নিয়ে নেমে জার্মান ফরোয়ার্ড টিমো ভের্নার ও মরোক্কান প্লেমেকার হাকিম জিয়াশকে আগামী গ্রীষ্মের দলবদলে নিশ্চিত করেছেন। প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে আরেক তরুণ জার্মান ফরোয়ার্ড কাই হাভের্টজের চেলসিতে আসাও। অর্থাৎ ক্লপের মতো শুরুতে দলের আক্রমণে গোল আর গতি যোগ করতে চাইছেন ল্যাম্পার্ডও।
কিন্তু ল্যাম্পার্ড এ দাবি মানতে রাজি নন। খেলোয়াড় কেনার ধরনে কিছুটা মিল থাকলেও লিভারপুলের সাফল্যের পদ্ধতি অনুকরণ করছেন না চেলসির কিংবদন্তি মিডফিল্ডার ও বর্তমান কোচ। সাফল্যের জন্য বরং ব্যবহার করতে চান ক্লাবের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি।
স্কাই স্পোর্টসে সাক্ষাতকারে প্রথমে লিভারপুলের প্রশংসাই ঝরেছে ল্যাম্পার্ডের কণ্ঠে,’ লিভারপুল অনেকদিন ধরে একসঙ্গে কাজ করছে। তবে ওদের যে দিকটা সবার আগে চোখে পড়বে, সেটি ওদের ধারাবাহিকতা। আমি জানি এটা অর্জন করা কতটা কঠিন। পারফরম্যান্স আর ফলের দিক থেকে এমন ধারাবাহিকতা প্রিমিয়ার লিগে খুব বেশি মৌসুমে দেখা যায়নি।’
এর পেছনে ক্লপের কৃতিত্বটাই চোখে পড়ছে ল্যাম্পার্ডের, তবে চেলসিতে তিনি ক্লপকে নকল করতে চাইছেন না বলেই জানালেন, ‘ওদের প্রতিটি বিভাগেই গতি, শক্তি ও ব্যক্তিগত নৈপুণ্য আছে। একটা দলকে তাদের কোচের চরিত্র ও আগ্রাসী দর্শনে খেলতে দেখা সব সময়ই দারুণ। (২০১৫ সালের অক্টোবরে) ক্লপ আসার পর এই আমূল বদলটা চোখে পড়েছে। তবে আমরা লিভারপুলকে অবিকল নকল করতে চাইছি, ব্যাপারটা এমন নয়। (লিভারপুল ও ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে) আমরা ব্যবধানটা ঘুচিয়ে আনব আমাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে।’

ল্যাম্পার্ড নিজেও অবশ্য চেলসিতে প্রথম মৌসুমে দারুণই করছেন। গত গ্রীষ্মে খুব খারাপ সময়ে চেলসির কোচের দায়িত্ব নেন। দলবদলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় নতুন কোনো খেলোয়াড় কিনতে পারেননি, ওদিকে চেলসি ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে চলে যান এডেন হ্যাজার্ড। অবশ্য দলবদলের নিষেধাজ্ঞা পড়ার আগেই বরুসিয়া ডর্টমুন্ড থেকে ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিককে কিনে রাখে চেলসি, যিনি দলে যোগ দেন এই মৌসুমের শুরুতে। তারওপর দলবদলে নিষেধাজ্ঞা, তরুণদের সুযোগ দেওয়া আর ক্লাবের সঙ্গে তাঁর অতীত – সব মিলিয়ে তাঁকে ঘিরে খুব বেশি প্রত্যাশার চাপ না থাকার সুবিধাও পেয়েছেন ল্যাম্পার্ড।
সেটির সুবিধা কী দারুণভাবেই না তুলে নিয়েছেন! দলকে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলিয়েছেন ল্যাম্পার্ড, এই মুহূর্তে লিগে সেরা চারে থেকে আগামী মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জনের খুব কাছে চেলসি। আজ বাংলাদেশ সময় রাত সোয়া একটায় সেটিরই বড় পরীক্ষা অবশ্য ক্লপের লিভারপুলের বিপক্ষেই!
এই মৌসুমে ম্যাসন মাউন্ট, বিলি গিলমোর, ট্যামি আব্রাহাম, রিস জেমস, ক্যালাম হাডসন ওডোয়ের মতো একাডেমির বেশ কিছু তরুণ খেলোয়াড়ের ওপর আস্থা রেখেছেন ল্যাম্পার্ড। ধীরে ধীরে তাঁরা ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হয়ে উঠবেন বলে মনে করেন তিনি ,’আমরা যা করেছি, তাকে সত্যিকারের উন্নতি বলেই মনে হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে আমাদের প্রত্যাশা সম্পর্কে ধারণা ছিল না। দলের অনেক খেলোয়াড় কেমন করবে, সেটা নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। অনেক খেলোয়াড়েরই এই মৌসুমে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয়েছে। আমি শুধু দেখতে চেয়েছিলাম, তারা কোথায় যেতে পারবে। আমরা কিছু ভালো পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে এসেছি। আমাদের এখন ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ আমরা চেলসি। জানি লিগের সেরা দুই দলের সঙ্গে (লিভারপুল ও ম্যান সিটি) আমাদের ব্যবধানটা অনেক, আর আমাদের সেটা ঘোচাতে হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *